
যাত্রা শুরুর একটা নিজস্ব উত্তেজনা আছে। আছে তার আনুষঙ্গিক আয়োজন — বাঁধাবাঁধি, গোছগাছ। তারপর ‘দুর্গা, দুর্গা’ বলে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে যে-ই না পথে নামা হল, তরী ভেসে চলল একঘাট ছুঁয়ে অন্যঘাটে, অমনি সব উদ্বেগ উধাও। চলমান জগত, জীবন তখন গোটা মনটির দখল নিয়ে বসল। নিত্য নতুন যাত্রীর আনাগোনা, তাদের সুখদুঃখের ঝাপটা লাগে তার গায়ে। আমাদের ‘মনভাসি’ও তেমনি খর বৈশাখে পাল খুলে দিয়ে খুশির উজানে পৌঁছে গেছে শ্রাবণের সজল মেঘের দরজায়। উদ্বোধনের লগ্নে আমরা একটু দ্বিধায় ছিলাম, তাই সেদিন পরের সংখ্যার কোন আগাম আভাস দিতে পারিনি। কিন্তু পাঠকের দরবার থেকে পাওয়া উচ্ছ্বাস বার্তার তাগিদে কোমর বাঁধতেই হল দ্বিতীয় সাজিটির জন্যে পুষ্পচয়নে। আর তখনই চোখ পড়ে গেল ক্যালেন্ডারের পাতার এক উজ্জ্বল তারিখে — ১৫ই আগস্ট।
বিশেষ করে এবছরে এ দিনটি আরও উল্লেখযোগ্য, কারণ স্বাধীন, সার্বভৌম, ভারতীয় গণতন্ত্রের এটি হল ৭৫ তম স্বাধীনতা দিবস। আর স্বাধীনতার কথাই যদি ওঠে, তবে ২০২১ সাল মনে করাবেই, ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র, আমাদের ‘জন্ম সহোদর’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির কথা। আশ্চর্য এক সমাপতনে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষ মুজিবর রহমানের শতবর্ষও পালিত হচ্ছে এবছর।
‘মনভাসি’র দ্বিতীয় সংখ্যায় আমরা দুই দেশের এই মুক্তির উদযাপনকে স্মরণ করতে চেয়েছি একটু অন্যভাবে। সমকালীন কবি, শিল্পী, শিল্পদ্রষ্টার কলমে উঠে এসেছে স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিকাশের খতিয়ান, আবার এপারের গবেষক শুনিয়েছেন আগুনঝরা দিনগুলির বড় হাতিয়ার, কম আলোচিত সেই স্বাধীন বাংলা বেতারের কথা। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন যত স্বদেশী নেতা, বিপ্লবী, তার মধ্যে আপামর বাঙালির কাছে সবচেয়ে ভালোবাসার নামটি যে সুভাষচন্দ্র বসু, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই কোন। নেতাজীর জীবন ও কর্মের প্রসঙ্গে আলোচনায় বারবার উঠে আসে তাঁর এলগিন রোডের বাসভবনের কথা, যা হয়ত অনেকেরই দেখা হয়নি এখনও। ‘মনভাসি’ ঘুরে দেখিয়েছে ঘরে না-ফেরা সুভাষের অজস্র স্মৃতিচিহ্ন সম্বল করে অনন্ত অপেক্ষায় থাকা সেই ঐতিহাসিক সৌধ।
জন্ম যাঁর ওপার বাংলায়, কর্ম মূলত এপারে, আবার সেই কর্মসূত্রেই দু’পারেই যিনি এক প্রিয়নাম, তেমনি এক বিশিষ্ট মানুষের সঙ্গে ঘরোয়া আলাপচারিতে সদলবলে অংশ নিয়েছিল টিম ‘মনভাসি’। এবারের সংখ্যায় থাকছে সেই যৌথ সাক্ষাৎকার।
মে থেকে আগস্ট, মাঝের এই তিনমাসে আমরা নিজেদের রাজ্যে নির্বাচিত সরকারকে নবপর্যায়ে কাজ শুরু করতে যেমন দেখলাম, দেখলাম ‘ইয়াশ’এর তাণ্ডব, স্কুলে চূড়ান্ত পর্বের সব পরীক্ষা বাতিল হয়ে গড় নম্বরের বিচিত্র সমাধান সূত্র, টিকা বিভ্রাট, জাল সরকারি আধিকারিক সাজার নাটক, কেন্দ্র-রাজ্য রাজনীতিতে বিবিধ টানাপোড়েন, আর টেলিফোনে আড়িপাতার দুষ্টচক্রের কৃৎকৌশল।
এরই পাশাপাশি অতিমারী কিংবা অন্য কারণে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে মৃত্যু মিছিল। পরিচিত বৃত্ত থেকে ইতিমধ্যেই একে একে সরে গেছেন কবি, চিত্রপরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অভিনেত্রী স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত, চলচ্চিত্র অভিনেতা দিলীপ কুমার, ক্রিকেটার যশপাল শর্মা, চিপকো আন্দোলনের জনক সুন্দরলাল বহুগুণা, আদিবাসী অধিকার রক্ষার মুখ পাদ্রী স্ট্যান স্বামী, চিত্রসাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকি এবং আরও আরও অনেকে।
সঙ্কটের এই বিপুল বিষন্নতা থেকে একটু হলেও মুক্তি দিতে ‘মনভাসি’ তার প্রিয পাঠকদেরও এবার সামিল করেছে তার সফরে। তাঁদের পাঠানো চিঠিপত্র আর অণুগল্প থেকে বাছাই করে নিয়ে চালু হল তাঁদের বিভাগ। তাছাড়াও নানা স্বাদের প্রবন্ধ, কবিতা, ভ্রমণ এবং নিয়মিত কলাম ছাড়াও যোগ হয়েছে তিনখানি গল্প।
স্বাধীনতার কথা, স্বদেশী যুগের কথা উঠলে আমাদের অন্তর্লোকে ‘ভারতমাতা’-র সেই চিরকল্যাণময়ী মূর্তিটি ভেসে উঠবেই। অমর সে চিত্রের শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের সার্ধশতবর্ষও পালিত হবে এবছর। শিশুপাঠ্য ‘বুড়ো আংলা’ বা’ক্ষীরের পুতুল’ই হোক, হোক তাঁর খেয়ালখুশির যাত্রাপালা কিংবা ‘বাগীশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী’ — ওবিন ঠাকুরের পাঠক ছবি দেখতে দেখতে অক্ষরের পথ ধরে এগিয়ে চলেন আপন খেয়ালে। মনভাসি তাঁকে স্মরণ করবে আগামী সংখ্যায়।
আপনাদের পাঠ প্রতিক্রিয়া এবং পরামর্শ আমাদের যাত্রাপথকে আরও সুগম করবে এই বিশ্বাসে —
কৃষ্ণ শর্বরী দাশগুপ্ত
সম্পাদক, মনভাসি
